অনেক চাষিই অভিযোগ করেন, নিয়মিত খাবার দিচ্ছি, পুকুরও দেখাশোনা করছি, তবু মাছ আশানুরূপ বড় হচ্ছে না। মাছের বৃদ্ধি কম হওয়ার পেছনে সাধারণত একটি নয়, কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করে। কারণটা আগে ধরতে পারলে অযথা খরচ না করেই সমস্যা কমানো যায়। এই লেখায় সম্ভাব্য কারণগুলো এবং প্রতিটির সহজ সমাধান ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো।
প্রথমে নিশ্চিত হোন বৃদ্ধি সত্যিই কম কি না
সব মাছ একই গতিতে বাড়ে না। প্রজাতি, মজুদের সময় এবং ঋতুর ওপর বৃদ্ধি নির্ভর করে। শীতকালে পানির তাপমাত্রা কমলে মাছ কম খায় এবং বৃদ্ধিও ধীর হয়, এটি স্বাভাবিক। তাই সমস্যা আছে কি না বোঝার জন্য প্রতি পনেরো দিন বা মাসে একবার জাল টেনে কয়েকটি মাছের ওজন ও দৈর্ঘ্য মেপে একটি খাতায় লিখে রাখুন। আগের মাপের সঙ্গে তুলনা করলে আপনি নিজেই বুঝবেন বৃদ্ধি থেমে আছে, নাকি শুধু ধীর গতিতে এগোচ্ছে।
নমুনা নেওয়ার সময় চেষ্টা করুন মাছের কম নাড়াচাড়া করতে। বারবার জাল টানলে মাছ চাপে পড়ে, ফলে নমুনা নেওয়াটাই বৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে। মাসে একবার যথেষ্ট।
পানির মান ও অক্সিজেন
পানির মান ভালো না থাকলে মাছ খাবার খেতে চায় না, আর খেলেও ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারে না। ভোরের দিকে মাছ পানির ওপরে এসে হাঁপাচ্ছে কি না দেখুন। এমনটা হলে বোঝা যায় রাতে অক্সিজেন কমে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পুকুরে অক্সিজেনের অভাব হলে করণীয় লেখাটি দেখতে পারেন।
এ ছাড়া পানি অতিরিক্ত গাঢ় সবুজ, ঘোলা বা দুর্গন্ধযুক্ত হলে এবং তলায় পচা কাদা জমলে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। নিয়মিত পানির রং, গন্ধ ও স্বচ্ছতা পর্যবেক্ষণ করুন। প্রয়োজনে কিছু পানি পরিবর্তন করা এবং অতিরিক্ত খাবার বন্ধ রাখা সহজ ও কার্যকর উপায়।
মজুদ ঘনত্ব বেশি হওয়া
বেশি পোনা ছাড়লে বেশি ফলন পাওয়া যাবে, এমন ধারণা সবসময় সত্য নয়। পুকুরের আকার, গভীরতা ও পানির মানের তুলনায় মাছ বেশি হলে খাবার ও অক্সিজেন নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। ফলে সব মাছই কম বাড়ে, আর দুর্বল মাছগুলো আরও পিছিয়ে পড়ে। মজুদের সঠিক নিয়ম জানতে পুকুরে পোনা মজুদের সঠিক নিয়ম লেখাটি দেখে নিতে পারেন।
যদি দেখেন পুকুরে মাছ খুব ঘন হয়ে গেছে, তবে কিছু মাছ ধরে বিক্রি করে ঘনত্ব কমিয়ে দেওয়া ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। এতে বাকি মাছ দ্রুত বাড়ার সুযোগ পায়।
খাবারের মান, পরিমাণ ও সময়
খাবার নিয়ে সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। খাবারের মান খারাপ হলে, বাসি বা স্যাঁতসেঁতে হলে অথবা প্রয়োজনের তুলনায় কম দিলে মাছ বাড়বে না। আবার বেশি দিলে অপচয় হয় এবং পানি নষ্ট হয়। তাই কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন:
- প্রতিদিন একই সময়ে খাবার দিন, যাতে মাছ অভ্যস্ত হয়ে যায়।
- খাবার দেওয়ার পর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখুন মাছ কত দ্রুত খাচ্ছে। খাবার পানিতে পড়ে থাকলে পরের বার কমিয়ে দিন।
- খাবারে প্রোটিনের পরিমাণ মাছের আকার অনুযায়ী ঠিক আছে কি না, তা খাবারের প্যাকেটের লেবেল বা মৎস্য কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নিন।
- খাবার শুকনো ও ছত্রাকমুক্ত জায়গায় রাখুন।
খাবার দেওয়ার বিস্তারিত নিয়ম পাবেন পুকুরে মাছকে খাবার দেওয়ার সঠিক নিয়ম লেখায়।
প্রাকৃতিক খাদ্য ও পুকুরের উর্বরতা
কার্প জাতীয় মাছ পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্যের ওপর অনেকটা নির্ভর করে। পানিতে প্ল্যাংকটন বা ক্ষুদ্র জলজ জীব কম থাকলে মাছের বৃদ্ধিও কমে যায়। পানি একেবারে স্বচ্ছ ও তলা পরিষ্কার দেখা গেলে প্রাকৃতিক খাদ্য কম থাকার সম্ভাবনা থাকে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে জৈব বা অজৈব সার প্রয়োগের পরিকল্পনা করতে পারেন। কোনো সারের পরিমাণ নিজের অনুমানে ঠিক করবেন না, কারণ অতিরিক্ত সার অক্সিজেন সংকট ডেকে আনতে পারে।
রোগ, পরজীবী ও মাছের স্বাস্থ্য
মাছ অসুস্থ থাকলে সে খাবার কম খায় এবং বৃদ্ধিও থেমে যায়। জাল টানার সময় মাছের গায়ে ক্ষত, পাখনা ছেঁড়া, ফুলকা ফ্যাকাশে বা গায়ে পরজীবী আছে কি না ভালো করে দেখুন। রোগের কোনো লক্ষণ চোখে পড়লে নিজে থেকে কোনো ওষুধ দেবেন না; স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তা বা অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত পানি ও পুকুর ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে ভরসার উপায়।
পোনার মান ও প্রজাতির মিশ্রণ
দুর্বল বা অপুষ্ট পোনা ছাড়লে পুরো মৌসুমেই তারা পিছিয়ে থাকে। কেনার সময় সুস্থ, সমান আকারের ও সক্রিয় পোনা বেছে নিন। এ ছাড়া একই পুকুরে খাদ্যাভ্যাসে মিল আছে এমন অনেক প্রজাতি একসঙ্গে বেশি পরিমাণে রাখলে প্রতিযোগিতা বাড়ে। উপরের, মাঝের ও নিচের স্তরের মাছের ভারসাম্য রেখে প্রজাতি নির্বাচন করলে পুকুরের স্থান ও খাদ্য ভালোভাবে কাজে লাগে।
সংক্ষেপে করণীয়
মাছের বৃদ্ধি কম মনে হলে প্রথমে নমুনা নিয়ে মাপ দেখুন, তারপর পানির মান, অক্সিজেন, মজুদ ঘনত্ব, খাবারের মান ও পরিমাণ, পুকুরের উর্বরতা এবং মাছের স্বাস্থ্য এক এক করে যাচাই করুন। একসঙ্গে অনেক কিছু বদলে না ফেলে একটি একটি করে কারণ খুঁজে ঠিক করলে কোন পরিবর্তনে ফল এসেছে তা বোঝা যায়। নিয়মিত খাতায় তথ্য লিখে রাখা এই কাজে অনেক সাহায্য করে।
নিয়মিত রেকর্ড রাখার অভ্যাস
অনেক চাষি সমস্যার পর কারণ খুঁজতে গিয়ে বুঝতে পারেন, কবে পোনা ছেড়েছিলেন, কত খাবার দিয়েছিলেন বা কবে পানি বদলেছিলেন তা মনে নেই। একটি সাধারণ খাতায় মজুদের তারিখ, পোনার সংখ্যা ও আকার, প্রতিদিনের খাবারের পরিমাণ, পানির রং এবং কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা লিখে রাখুন। মাস শেষে খাতাটি দেখলে কোন সময়ে বৃদ্ধি কমেছে এবং তখন কী পরিবর্তন হয়েছিল তা সহজে ধরা যায়।
এই রেকর্ড পরবর্তী মৌসুমে পরিকল্পনা করতেও কাজে লাগে। কোন প্রজাতি আপনার পুকুরে ভালো বেড়েছে, কোন সময়ে খাবার বাড়ানো দরকার হয়েছিল এবং কোন মাসে সমস্যা বেশি হয়েছিল, এসব তথ্য থেকে আপনি নিজের অভিজ্ঞতার একটি ভান্ডার তৈরি করতে পারবেন।
ঋতু ও তাপমাত্রার প্রভাব
মাছ ঠান্ডা রক্তের প্রাণী, তাই পানির তাপমাত্রা বদলালে তাদের খাওয়া ও বৃদ্ধির হারও বদলে যায়। খুব গরমে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায় এবং মাছ অস্থির হয়ে পড়ে। আবার শীতে হজমশক্তি কমে যায় ও মাছ কম খায়। তাই ঋতু অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ সামান্য কমানো-বাড়ানো দরকার হয়। হঠাৎ করে বেশি খাবার দিলে হজম না হয়ে পানিতে মিশে নষ্ট হয়। আবহাওয়া মেঘলা বা বৃষ্টির সময় পানির অবস্থা বদলে যেতে পারে, সে সময় বাড়তি সতর্ক থাকুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
মাছ কতদিন পর বৃদ্ধি কম বলে ধরা উচিত?
প্রজাতি ও ঋতুভেদে বৃদ্ধির হার আলাদা। তবে একটানা এক-দেড় মাস নমুনা মাপে প্রায় কোনো পরিবর্তন না পেলে কারণ খোঁজা শুরু করা ভালো।
বেশি খাবার দিলে কি মাছ দ্রুত বাড়ে?
না। মাছ যতটুকু খেতে পারে তার বেশি দিলে খাবার নষ্ট হয়, পানি দূষিত হয় এবং অক্সিজেন কমে যায়। ফলে উল্টো বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
বৃদ্ধি কম হলে কি পোনা বদলাতে হবে?
প্রথমেই পোনা বদলানোর সিদ্ধান্ত নেবেন না। আগে পানির মান, খাবার ও ঘনত্ব দেখুন। পরবর্তী মৌসুমে সুস্থ ও নির্ভরযোগ্য উৎসের পোনা নিলে ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
উপসংহার
মাছের বৃদ্ধি কম হওয়া একদিনের সমস্যা নয়, এটি সাধারণত ছোট ছোট অবহেলার ফল। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পরিমিত খাবার, পরিষ্কার পানি ও সঠিক ঘনত্ব বজায় রাখলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অবস্থার উন্নতি হয়। কোনো সমস্যা নিজে বুঝতে না পারলে এলাকার মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নিন।