মাছ চাষের মোট খরচের একটি বড় অংশ যায় খাবারে। তাই কীভাবে ও কতটা খাবার দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর লাভ-লোকসান অনেকটাই নির্ভর করে। অনেক চাষি বেশি খাবার দিলেই মাছ দ্রুত বড় হবে ভেবে খাবার বাড়িয়ে দেন, অথচ এতে পানি নষ্ট হয় এবং খরচও বাড়ে। এই লেখায় নিয়ম করে খাবার দেওয়ার সহজ কিছু ধারণা তুলে ধরা হলো।
প্রাকৃতিক খাবার ও সম্পূরক খাবারের পার্থক্য
পুকুরে সার ও চুনের সঠিক ব্যবহারে প্লবক বা ক্ষুদ্র জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী জন্মায়, যা মাছের প্রাকৃতিক খাবার। কম ঘনত্বের পুকুরে এই প্রাকৃতিক খাবারই অনেকটা চাহিদা মেটায়। কিন্তু মজুদ ঘনত্ব বাড়লে শুধু প্রাকৃতিক খাবারে চলে না, তখন বাইরে থেকে সম্পূরক খাবার দিতে হয়। অর্থাৎ সম্পূরক খাবার প্রাকৃতিক খাবারের বিকল্প নয়, বরং তার পরিপূরক।
দিনে কতবার খাবার দেবেন
ছোট পোনাকে দিনে কয়েকবার অল্প অল্প করে খাবার দেওয়া ভালো, কারণ তাদের পাকস্থলী ছোট ও হজম দ্রুত হয়। মাছ বড় হলে দিনে দুইবার, যেমন সকাল ও বিকেলে, দেওয়াই সাধারণত যথেষ্ট। প্রতিদিন একই সময়ে খাবার দিলে মাছ অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং নির্দিষ্ট জায়গায় এসে জড়ো হয়। এতে আপনার পর্যবেক্ষণ সহজ হয়।
খাবারের পরিমাণ কীভাবে ঠিক করবেন
খাবারের পরিমাণ সাধারণত মাছের মোট ওজনের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে ধরা হয়। মাছ ছোট থাকলে এই শতাংশ তুলনামূলক বেশি হয় এবং মাছ বড় হলে কমে আসে। তাই কিছুদিন পরপর নমুনা হিসেবে কিছু মাছ ধরে গড় ওজন দেখে খাবারের পরিমাণ সামঞ্জস্য করতে হয়।
নির্দিষ্ট প্রজাতি ও খাবারের ধরনভেদে সঠিক শতাংশ আলাদা হয়, আর খাবারের প্যাকেট বা সরবরাহকারীর নির্দেশনাও দেখে নেওয়া উচিত। খাবার কতটা কাজে লাগছে, অর্থাৎ রূপান্তর হার নিয়ে ধারণা পেতে পোনা মাছের খাদ্যের এফসিআর লেখাটি পড়তে পারেন।
খাবার দেওয়ার পদ্ধতি
খাবার একসঙ্গে এক জায়গায় ফেলে দেওয়ার চেয়ে ছড়িয়ে দেওয়া ভালো, যাতে সব মাছ সমানভাবে খেতে পারে। কিছু চাষি পুকুরের নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে ট্রে বা ভাসমান ফ্রেম ব্যবহার করেন, এতে খাবার কতটা খেল তা দেখা সহজ হয়। ভাসমান খাবারে মাছ খেতে আসছে কি না চোখে দেখা যায়, আর ডুবন্ত খাবারে অতিরিক্ত খাবার তলায় জমে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে দিন এবং মাছ যতক্ষণ আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছে, কেবল ততক্ষণই দিন। মাছ খাওয়া বন্ধ করে দিলে বাকি খাবার পুকুরে ফেলে রাখবেন না।
আবহাওয়া ও পানির অবস্থা বুঝে খাবার সমন্বয়
খুব গরম, মেঘলা বা গুমোট দিনে এবং ঠান্ডা সময়ে মাছের খাবারের চাহিদা কমে যায়। এই সময় আগের মতোই খাবার দিলে অব্যবহৃত খাবার পানিতে পচে অ্যামোনিয়া ও অন্যান্য সমস্যা তৈরি করে। বৃষ্টির দিনে বা পানির রং হঠাৎ বদলে গেলে খাবার কমিয়ে দেওয়াই নিরাপদ।
মাছ অসুস্থ মনে হলে বা পানির গন্ধ বদলে গেলে খাবার সাময়িকভাবে কমিয়ে কারণ খুঁজুন। পুকুর প্রস্তুতি ঠিকভাবে হয়েছিল কি না দেখতে পুকুর প্রস্তুতির ধাপ লেখাটির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন।
খাবারের মান ও সংরক্ষণ
ফাঙ্গাস ধরা, ভিজে যাওয়া বা গন্ধ হয়ে যাওয়া খাবার মাছকে কখনোই দেবেন না। এতে মাছের পাকস্থলীর সমস্যা এবং রোগ হতে পারে। খাবার শুকনো, ছায়াযুক্ত ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় রাখুন এবং মেঝেতে না রেখে তক্তার ওপর রাখুন। বাড়িতে তৈরি খাবার হলে উপকরণ টাটকা কি না, তা যাচাই করে নিন।
কার্প ও পাঙ্গাস মিশ্র চাষের ক্ষেত্রে খাবার দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পেতে কার্প জাতীয় মাছ এবং পাঙ্গাস চাষ পদ্ধতি ও খাবার নির্দেশিকা দেখতে পারেন।
রেকর্ড রাখার অভ্যাস
প্রতিদিন কতটা খাবার দিলেন, মাছ কেমন খেল এবং আবহাওয়া কেমন ছিল, এসব একটি খাতায় লিখে রাখুন। কয়েক সপ্তাহ পর এই রেকর্ড থেকে বুঝতে পারবেন কোন সময়ে খাবার বেশি লাগছে বা কোথায় অপচয় হচ্ছে। এতে পরের মৌসুমের পরিকল্পনা অনেক সহজ হয়ে যায়।
ভাসমান ও ডুবন্ত খাবার বেছে নেওয়ার সময় যা ভাববেন
খাবার কেনার সময় শুধু দাম দেখলে চলে না, বরং খাবারের গুণ, মাছের প্রজাতি ও পুকুরের অবস্থার সঙ্গে মিল আছে কি না, তা দেখা জরুরি। ভাসমান খাবারে মাছের খাওয়া দেখে পরিমাণ ঠিক করা সহজ, কিন্তু দাম তুলনামূলক বেশি হতে পারে। ডুবন্ত খাবারে দাম কম হলেও কতটা খেল তা বোঝা কঠিন, ফলে অপচয়ের ঝুঁকি থাকে। নিজের সামর্থ্য ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন।
খাবারের প্যাকেটের গায়ে লেখা প্রস্তুতের তারিখ ও মেয়াদ দেখে নিন। খুব পুরোনো বা ভিজে যাওয়া প্যাকেট কিনবেন না। একবারে অনেক বেশি পরিমাণ না কিনে প্রয়োজনমতো কিনলে খাবার টাটকা থাকে এবং সংরক্ষণের ঝামেলাও কমে।
বিভিন্ন বয়সে খাবারের ধরনে পরিবর্তন
মাছের বয়স বাড়লে খাবারের দানার আকার ও পুষ্টির চাহিদাও বদলায়। ছোট পোনাকে সূক্ষ্ম ও আমিষসমৃদ্ধ খাবার দেওয়া হয়, যাতে তারা সহজে খেতে ও হজম করতে পারে। বড় হলে বড় দানার খাবারে স্থানান্তর করা হয়। হঠাৎ করে খাবারের ধরন পাল্টে দিলে মাছ খেতে অনীহা দেখাতে পারে, তাই কয়েক দিন ধরে পুরোনো ও নতুন খাবার মিশিয়ে ধীরে ধীরে বদলান।
কোনো পর্যায়ে কোন ধরনের খাবার ভালো, সে বিষয়ে আপনার এলাকার মৎস্য কর্মকর্তা বা অভিজ্ঞ চাষির পরামর্শ নিতে পারেন। একই পুকুরের সব মাছ একই গতিতে বাড়ে না, তাই মাঝেমধ্যে নমুনা মাছ ধরে অবস্থা পরীক্ষা করা ভালো অভ্যাস।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মাছ খাবার না খেলে কী করব?
প্রথমে পানির রং, গন্ধ ও অক্সিজেনের অবস্থা দেখুন। আবহাওয়া খুব খারাপ থাকলে বা মাছ অসুস্থ হলে খাবারের আগ্রহ কমে যায়। কারণ না বুঝে খাবার বাড়াবেন না; প্রয়োজনে স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলুন।
বেশি খাবার দিলে মাছ কি দ্রুত বড় হয়?
না। একটি সীমার পরে অতিরিক্ত খাবার মাছ খায় না বা হজম করতে পারে না। বাকিটা পানিতে নষ্ট হয়ে পানির মান খারাপ করে এবং রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
নিজে খাবার তৈরি করলে কী খেয়াল রাখব?
উপকরণ টাটকা ও পরিষ্কার হতে হবে এবং ভালোভাবে মিশিয়ে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো উপকরণ নিয়ে সন্দেহ থাকলে ব্যবহার না করাই ভালো।
সারসংক্ষেপ
নিয়মিত সময়ে, পরিমিত পরিমাণে এবং মাছের আচরণ দেখে খাবার দেওয়াই ভালো ব্যবস্থাপনার মূল কথা। অপচয় কমালে খরচ কমে, পানির মান ভালো থাকে এবং মাছের স্বাস্থ্যও ভালো থাকে। প্রতিদিনের একটু মনোযোগই মৌসুম শেষে বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।